খোঁজ রাখুন সন্তানের,ভয়ংকর মরণ নেশা ‘ব্লু হোয়েল’ আঘাত করেছে বাংলাদেশে
বিজয় ডেস্ক: ভয়ংকর মরণ নেশা ব্লু হোয়েল আঘাত করেছে বাংলাদেশে। গেমের ফাঁদে পড়ে ব্লু
হোয়েলের নির্দেশে রাজধানীতে আত্মহত্যা করেছে স্বর্ণা নামের এক কিশোরী।
বৃহস্পতিবার রাতে সেন্ট্রাল রোডের বাসায় নিজের পড়ার কক্ষে ফ্যানের সঙ্গে
ঝুলন্ত অবস্থায় অপূর্বা বর্মণ স্বর্ণা (১৩) নামে ওই শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার
করে পুলিশ।স্বর্ণা বিদ্যালয়ের ফার্স্ট গার্ল হিসেবে পরিচিত ছিল। ওয়াইডব্লিউসিএ হাইয়ার
সেকেন্ডারি গার্লস স্কুলে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্মিলিত মেধা
তালিকায় তার অবস্থান ছিল প্রথম। মেধাবী ওই শিক্ষার্থী এই গেমের ফাঁদে পড়ে
গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করায় শঙ্কিত এ দেশের অভিভাবকেরাও।
পুরো বিশ্বে ত্রাস ছড়িয়েছে অনলাইনভিত্তিক
গেম ‘ব্লু হোয়েল’। ৫০ দিনে ৫০ ধাপে এই গেমটি শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখেই
ঠেলে দেয় প্রতিযোগীকে। সাধারণত অবসাদগ্রস্ত-বিষণ্ন কিশোর-কিশোরীদের আকৃষ্ট
করে এই গেম।
এখন পর্যন্ত সারাবিশ্বে এই
গেমের ফাঁদে পড়ে যতজনের প্রাণ ঝরেছে, তার মধ্যেও বেশিরভাগই কিশোর-কিশোরী।
সেজন্য দেশের অভিভাবকদের পরামর্শ দিয়ে মনোবিদরা বলছেন, যেন তাদের শিশু ও
কিশোর-কিশোরী সন্তানদের ওপর নজর রাখা হয়। বিশেষত যারা ইন্টারনেট-স্মার্টফোন
ব্যবহার করে।
মরণ নেশায় আক্রান্ত হয়ে
স্বর্ণা ছাড়াও বাংলাদেশে আরও কয়েকজন তরুণ-তরুণী আত্মহত্যা করেছে বলে
অসমর্থিত বিভিন্ন খবরে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ভারত, চীন, ব্রাজিল,
রাশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে কয়েকশ তরুণ-তরুণীর মৃত্যু হয়েছে ব্লু
হোয়েলের ফাঁদে পড়ে।
** Blue whale
(ব্লু হোয়েল) এর অর্থ নীল তিমি। মৃত্যুর আগে নীল তিমিরা সাগর থেকে তীরে উঠে
আসে। সেজন্য কেউ কেউ ধারণা করেন, তিমিরা আত্মহত্যা করে। এ কারণে এই গেমের
নামকরণ হয়েছে ‘ব্লু হোয়েল’। এই গেম কারো পাঠানো গোপন লিংকের মাধ্যমে
ছড়াচ্ছে ডিজিটাল ডিভাইসে। একবার ইনস্টল হয়ে গেলে ডিভাইস রিসেট করা ছাড়া আর
রিমোভ করা যায় না গেমটি। পুরো গেম নিয়ন্ত্রণ করে আড়ালে থাকা একদল কিউরেটর।
**
এই গেমে প্রতিযোগীকে মোট ৫০টি আত্মনির্যাতনমূলক ধাপ শেষ করতে হয়। প্রথম
দিকের ধাপগুলো তুলনামূলক অ্যাডভেঞ্চারাস, মজার ও সহজ মনে হলেও শেষ ধাপগুলো
একেবারেই ভয়ঙ্কর। কিন্তু প্রথম দিকে মজা পেয়েই প্রতিযোগী কিশোর-কিশোরীরা
আসক্ত হয়ে পড়েন এতে। আর সেই আসক্তির সুযোগ নিয়েই গেমটি তাকে ধীরে ধীরে নিয়ে
যায় শেষ পরিণতি মৃত্যুতে।
** এই গেমের
প্রথম ১০টি ধাপে প্রতিযোগীকে বেশ আকর্ষণ করার মতো। যেমন মধ্যরাতে ঘুম থেকে
উঠে ভৌতিক মুভি দেখা, চিৎকার-চেঁচামেচি করা, ভোরে ছাদের কিনারা ধরে
হাঁটাহাঁটি করা। এরপর ক্রমেই মোহাবিষ্ট করে একে একে আসতে থাকে শরীরে একাধিক
সুঁই বিদ্ধ করা, নিজের হাত রক্তাক্ত করে তিমির ছবি আঁকা ইত্যাদি। এই গেমের
ছলেই কিউরেটররা হাতিয়ে নেয় প্রতিযোগীর ব্যক্তিগত ও
পারিবারিক
অনেক তথ্য। শেষ পর্যায়ে প্রতিযোগী বুঝতে পারে যে, এই গেম তাকে ধ্বংসের
দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেজন্য মুক্তি পেতেও চাইবে সে। তখনই ফাঁদ পাতবে কিউরেটর।
হাতিয়ে নেওয়া তথ্য ব্যবহার করেই প্রতিযোগীর পরিবারের এমনকি মা-বাবার ক্ষতি
করার হুমকি দেবে। বলবে, মুক্তি পেতে চাইলে তার কথা মতো কাজ করতে হবে।
প্রতিযোগীও উপায় না পেয়ে কিউরেটরের কথা অনুযায়ী ধাপ অতিক্রমে এগিয়ে যাবে।
এগিয়ে যাবে আত্মহত্যার দিকে। সেটা বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে, বা গায়ে আগুন
ধরিয়ে অথবা গলায় ফাঁস দিয়ে কিংবা অন্য কোনো উপায়ে।
**
২০১৬ সাল থেকে ছড়িয়ে পড়া এই প্রাণঘাতী গেমের কিউরেটর সন্দেহে সে বছরই
ফিলিপ বুদেকিন নামে এক তরুণকে পাকড়াও করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে ওই তরুণ
স্বীকার করেন, এই গেমের শিকার যারা, তারা সমাজে বেঁচে থাকার যোগ্য নয়।
তাদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়ে সমাজ সংস্কার করছে ‘ব্লু হোয়েল’।
এ
বিষয়ে জানতে চাইলে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ
অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সভাপতি
মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘এটি মূলত গেমস না, একজন ক্যাপ্টেন পেছন থেকে এটি
পরিচালনা করে। এর মোট ৫০টি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। ৫০তম ধাপে গিয়ে বলা হয়,
আত্মহত্যা করতে। আর প্রতিটি ধাপেই ব্যবহারকারীকে একটি করে চ্যালেঞ্জ দেওয়া
হয়। কোনো মানুষ এ ধরনের ঘটনার শিকার হোক বা এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে
যুক্ত থাকুক, এটা কেউ চায় না। আমাদের এখানে যে ঘটনা ঘটেছে, তার জন্য আমরা
দুঃখ প্রকাশ করছি। আমাদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দিয়ে যদি এটি ঢুকে, তবে
জাতীয়ভাবে এর গেটওয়ে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। ভারতে এরই মধ্যে যেসব এলাকায় এর
লিংক আছে, তা মুছে দেওয়া হয়েছে বা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সরকারের অবশ্যই এ
ক্ষেত্রে এগিয়ে আসা উচিত। কারণ, ইন্টারনেটের গেটওয়ে সরকারের হাতে। আমরা
শুধু সচেতনতা বাড়াতে পারব। এটি ব্লক করে দেওয়ার চাবি সরকারের হাতে।’


কোন মন্তব্য নেই