রংপুরে রাত পোহালেই ভোট



বিজয় ডেস্ক: রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষে ভোটারদের মধ্যে এখন চলছে অঙ্কের হিসাব। নয় বছর পর নৌকা-লাঙ্গল-ধানের শীষের সরাসরি লড়াই দেখতে যাচ্ছে নগরবাসী। আজ বুধবার রাত পোহালেই ভোট। ২১ ডিসেম্বর রংপুরবাসী পাচ্ছে নতুন নির্বাচিত মেয়র। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এই ভোট শুধু রংপুরের নতুন মেয়র নয়; জাতীয় রাজনীতির হিসাব-নিকাশেও প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন বিশ্নেষকরা।

তাদের মতে, এ ভোট কে. এম. নুরুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বিএনপির আপত্তির মুখে দায়িত্ব নেওয়া বর্তমান কমিশন কী ভূমিকা পালন করে সেটা তারা দেখতে চাইবে। রংপুর সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সভাপতি আফতাব হোসেন মনে করেন, এই নির্বাচন জাতীয় পার্টির জন্য অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই হলেও আওয়ামী লীগ বা বিএনপির হারানোর বিশেষ কিছু নেই।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মূল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীর মধ্যে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন প্রশ্নে কোনো সংশয় নেই। বিএনপির পক্ষ থেকে নানা অভিযোগ তোলা হলেও মাঠের পরিস্থিতি ভিন্ন। দেশের অন্য যে কোনো নির্বাচনের তুলনায় এখানে স্বাচ্ছন্দ্যে নির্বাচনী কাজে অংশ নিতে পারছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এই নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার বিষয়ে পুরোপুরি আশাবাদী বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ।

বিশ্নেষকদের মতে, লাঙ্গল জিতলে জাতীয় রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের গুরুত্ব বজায় থাকবে। অন্যদিকে এই শহরে ভোটের রাজনীতিতে বরাবরের জন্য পিছিয়ে থাকা বিএনপি এবার তাদের ভোটের হিসাব যাচাইয়ের সুযোগ কাজে লাগাতে চাচ্ছে। জোটের শরিক দল জামায়াতের সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে তারা ভালো ফল তুলতে মরিয়া। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ প্রার্থীও জিততে চান; তবে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে; যাতে সরকারের ইমেজের কোনো ক্ষতি না হয়। রোকেয়া

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও গবেষক

ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, এই নির্বাচনে লাঙ্গল জিতলে এরশাদ মহাজোটের কাছে আগামী সংসদ নির্বাচনে রংপুরের ২২টি আসনই দাবি করতে পারেন।

জটিল হয়ে পড়ছে ভোটের অঙ্ক

বিগত সিটি নির্বাচন দলীয় প্রতীকে না হলেও প্রার্থীদের ওই সময়ের ভোটের সঙ্গে দলীয় প্রতীকের ভোট মিলিয়ে হিসাব করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই শহরের বর্তমানে তিন লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ ভোটের মধ্যে পাঁচ বছরে নতুন ভোটার যুক্ত হয়েছে ৩৬ হাজার। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার রয়েছেন ৭০ হাজারের বেশি। বিহারি (আটকেপড়া পাকিস্তানি) ভোটার রয়েছে ৩০ হাজারের মতো। বিলুপ্ত রংপুর পৌরসভা এলাকা নিয়ে গঠিত ১৫টি ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা আড়াই লাখ। নতুন বর্ধিত ১৮ ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। বর্ধিত ওয়ার্ডে উন্নয়ন কম হওয়ায় এখানে ঝন্টুর অবস্থা তেমন একটা ভালো নয় বলেই কেউ কেউ মনে করছেন। অন্যদিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও বিহারিদের একটা বড় অংশের ভোট ঝন্টুর পক্ষে রয়েছে।

তবে এই ভোট ব্যাংক কার জন্য কতটা সহায়ক হবে তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না বলে মনে করছেন ড. তুহিন ওয়াদুদ। তার মতে, দীর্ঘদিন পরে দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় বিএনপি-জামায়াতের রিজার্ভ ভোট সম্পর্কে ধারণা করা যাচ্ছে না। অতীতের হিসাবে এই ভোট ৫০ হাজারের মতো বলা হলেও এই অঙ্কে বড় ধরনের পরিবর্তনের আশঙ্কা করছেন তিনি। কারণ, জামায়াত প্রকাশ্য তৎপরতা চালাতে না পারলেও তারা এতদিন নিষ্ফ্ক্রিয় থাকেনি। বিশেষ করে এই অঞ্চলের নারী ভোটারদের ওপর তারা গোপনে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছেন তা পরিস্কার নয়। বিএনপি এই নির্বাচনে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকার এটাও একটা কারণ হতে পারে বলে তিনি মনে করছেন।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবার প্রতিমন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী মসিউর রহমান রাঙ্গা মনে করেন, বিএনপি-জামায়াত জোট এই নির্বাচনে ৪০ হাজারের বেশি ভোট পাবে না। তার দাবি, জাতীয় পার্টির প্রার্থী ৬০ হাজার থেকে এক লাখ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হবে। তিনি বলেন, এই নির্বাচনে লাঙ্গল জিতলে সরকারই জিতবে। কারণ জাপা সরকারের শরিক দল। নৌকা হারলে আওয়ামী লীগ নয়, ঝন্টু হারবেন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী অবশ্য মনে করেন, ভোটের যে কোনো অঙ্কেই আওয়ামী লীগ এগিয়ে। তার দাবি, প্রার্থী নিয়ে শুরুতে দলের মধ্যে কিছুটা বোঝাপড়ার অভাব থাকলেও এখন আর তা নেই। ভোটের আগের ৪৮ ঘণ্টায় মাঠের পরিস্থিতি আরও পরিবর্তন হবে। কেননা আওয়ামী লীগ সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এখন মাঠে নেমে পড়েছেন। তিনি বলেন, রংপুরবাসী দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারে থাকায় তারা উন্নয়নের স্বাদ পাচ্ছে। তাই উন্নয়নের বিচারেই আওয়ামী লীগই এগিয়ে থাকবে।

বিএনপির ভাইস প্রেসিডেন্ট ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, সরকারের দুঃশাসন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে রংপুরবাসী এবার ধানের শীষের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে, মানুষ অবাধে ভোট দেওয়ার সুযোগ পেলে ধানের শীষ বিজয়ী হবে।

শেষ দিনে তৎপর সব পক্ষই :মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে প্রচার শেষ হওয়ায় ভোটের দিনের কৌশল নির্ধারণে ব্যস্ত প্রার্থী ও সমর্থকরা। ভোট সামনে রেখে নগরীতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির টহল বেড়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো এবং প্রবেশ ও বের হওয়ার পথগুলোতে চেক পোস্ট বসানো হয়েছে। তবে বাড়তি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সামনেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের দৃশ্য দেখা গেছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে মোটরসাইকেল মহড়া ও মিছিল করতে দেখা গেছে শেষ দিনে। আচরণবিধি অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারে কোনো ধরনের মোটরসাইকেল মহড়া ও মিছিল করা নিষিদ্ধ। এছাড়া মঙ্গলবার মধ্যরাত থেকে ভোটের পরদিন ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত নগরীতে মোটরসাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সোমবার মধ্যরাত থেকে সিটি করপোরেশন এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থান নিষিদ্ধ রয়েছে।

রংপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রিটার্নিং কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার বলেন, নির্বাচনের পরিবেশ ও পরিস্থিতি অত্যন্ত ভালো রয়েছে। উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় আছে। ভোটগ্রহণের সব ধরনের প্রস্তুতি একপ্রকার শেষ। আজ বুধবার নির্বাচনী সামগ্রী বিতরণ শুরু হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নির্বাচনে পরিবেশ রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাঁচ থেকে সাড় পাঁচ হাজার সদস্য মোতায়েন রয়েছে।

একনজরে রসিক নির্বাচন :দেশের দশম সিটি করপোরেশন হিসেবে ২০১২ সালের ২৮ জুন রংপুর সিটির আত্মপ্রকাশ ঘটে। বিলুপ্ত রংপুর পৌরসভা এবং রংপুর জেলার সদর, কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে এ সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়। আগামী ২১ ডিসেম্বর দ্বিতীয় বারের মতো এই সিটিতে ভোটগ্রহণ। এতে মেয়র পদে সাতজন, ৩৩টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১১ জন ও সংরক্ষিত ১১টি ওয়ার্ডে ৬৫ জন নারী কাউন্সিলর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে মেয়র পদে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হলেও কাউন্সিলর পদে নির্দলীয় প্রতীকে ভোট হবে। এতে মোট ১৯৬টি ভোটকেন্দ্রে ১ হাজার ১৭৭টি ভোটকক্ষ রয়েছে। মোট ভোটার ৩ লাখ ৯৩ হাজার ৯৯৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯৬ হাজার ৩৫৬ এবং নারী ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৩৮ জন। সর্বশেষ ২০১২ সালের ২০ ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো রংপুর সিটি করপোরেশনে ভোট হয়েছিল।

চারস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা :রসিক নির্বাচন উপলক্ষে চারস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন রংপুর ডিভিশনের পুলিশের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, নিরাপত্তার চাদরে পুরো এলাকা ঢেকে ফেলা হয়েছে। নির্বাচনে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি, আনসারসহ ৭ হাজার সদস্য থাকছে। চারটি স্থানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য রিজার্ভ হিসেবে রাখা হবে, যাতে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে মোতায়েন করা যায়। তিনি বলেন, নির্বাচনী এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবেন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.